Wednesday, July 17, 2013

ফাইবারের ভাস্কর্য

ফাইবারের
যেভাবে বাননো হয় ভাস্কর্য
রেজিন, কেমিক্যাল এঙ্েেলটর, ওভাল, সাদা পাউডার রং, মোম ও জেলকোড দিয়ে কেমিক্যাল মিঙ্ার বানাতে হয়। পা থেকে শুরু করে পরতে
পরতে মিঙ্ার দিয়ে ফাইবার গ্লাস লাগিয়ে যেতে হয়। দুই থেকে তিন দিনে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় একটি ভাস্কর্য।

কাঁচামাল ও লাভ
ফাইবার ভাস্কর্য বানাতে প্রয়োজন পড়বে ফাইবার গ্লাস, রেজিন, কেমিক্যাল এঙ্েেলটর, ওভাল, পাউডার, সাদা রং, মোম, জেলকোড। আর লাগবে
একজনের ছয় দিনের সমপরিমাণ শ্রম। কাঁচামাল সংগ্রহ করা যাবে গুলিস্তানের নাসির গ্লাস নামের দোকান থেকে। এ ছাড়া যেকোনো পাইকারি প্লাস্টিক
কাঁচামাল আমদানিকারক দোকান থেকেও সংগ্রহ করা যাবে এসব কাঁচামাল।

মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা


মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হচ্ছে সিলেটে  নাজমুল আলম শিশির
বাংলাদেশে মাশরুমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে মাশরুমের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ আগের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে। দিনে দিনে মাশরুম সম্পর্কে মানুষের নানা ভ্রান্ত ধারণাও পাল্টে যাচ্ছে। অনেকেরই প্রিয় খাদ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে মাশরুম। ফলে বাড়ছে উৎপাদন, সম্প্রসারিত হচ্ছে বাজার। আর লাভবান হচ্ছেন মাশরুম চাষীরা। এ সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের প্রথম মাশরুম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে সিলেট মাশরুম উৎপাদন বিপণন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড।
মাশরুম চাষ এবং বিপণনের সঙ্গে জড়িতরা জানান, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে মাশরুমের বাজার ছিল সীমিত। কেবল ঢাকাসহ বড় বড় শহরের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, তারকাখচিত হোটেল ও বিদেশি ফাস্টফুডের দোকানেই ছিল মাশরুমে চাহিদা। ক্রেতা ছিলেন দেশে অবস্থানরত বিদেশিরা। এখন দেশীয়দের ভেতরেই গড়ে উঠেছে মাশরুমের ভোক্তা-শ্রেণী। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ফাস্টফুডের দোকানের পাশাপাশি ফুটপাতেও মাশরুমের তৈরি খাবার পাওয়া যাচ্ছে।
চাষীরা বলছেন, অন্য যে কোনো চাষের চেয়ে মাশরুমের চাষ লাভজনক। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ সব দিক থেকেই মাশরুম চাষ বাংলাদেশের জন্য লাভজনক। মাশরুম চাষে পুঁজি ও শ্রম লাগে কম। আর মাত্র সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে মাশরুম পাওয়া যায়। আর খরা, বৃষ্টি বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাশরুম উৎপাদন ব্যাহত হয় না বলে লোকসান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। মাশরুম চাষী গৌর বন্ধু দাস কাঁচা মাশরুমের উৎপাদন খরচ কেজিতে ৬০ থেকে ৭০ টাকা বলে জানান। আর বাজারে বিক্রি হয় ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি। আর শুকনা মাশরুম প্রতি কেজি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
জাপান সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকার অদূরে সাভারের হর্টিকালচার সেন্টারে আশির দশকের শুরুতে দেশের সর্বপ্রথম মাশরুম চাষ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ১৯৮৭ সালে মাশরুম চাষের প্রসারে এগিয়ে আসে। মাশরুম চাষের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। এরপর ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্প নামে আরো একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত চার বছর মেয়াদি মাশরুম উন্নয়ন জোরদার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সারাদেশে ১৬টি সাব সেন্টারের মাধ্যমে এই প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে মাশরুম চাষ হচ্ছে। বিশ্বের উৎপাদিত মাশরুমের ৭০ ভাগই উৎপাদন হয় চীনে। আর ব্যবহারের দিক দিয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে উৎপাদিত মাশরুমের শতকরা প্রায় ৩০ ভাগই ব্যবহৃত হয় আমেরিকায়। এ ছাড়া জার্মানিতে শতকরা ১৭ ভাগ, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে ১১ ভাগ, ইতালিতে ১০ ভাগ এবং কানাডায় বিশ্বে উৎপাদিত মাশরুমের শতকরা ৬ ভাগ ব্যবহৃত হয়। বাদবাকি ১৫ ভাগ মাশরুম ব্যবহার হয় বিশ্বের বাকি দেশসমূহে।
বাংলাদেশে আগের তুলনায় বর্তমানে মাশরুমের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। সিলেট মাশরুম উৎপাদন বিপণন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডেরই সদস্য আছে ২২১ জন চাষী। এই সমিতি মাশরুমের বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শ্রীরামপুরে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ল্যাব থেকে প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার উন্নতমানের মাশরুম বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রথম মাশরুম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে। 'ওয়েস্টার ফুড অ্যান্ড সুইট্স্ ইন্টাস্ট্রিজ' নামের এই প্রক্রিয়াজাতকণ কেন্দ্রে প্রাথমিকভাবে প্রায় দুই কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে সিলেট মাশরুম উৎপাদন বিপণন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এরই মধ্যে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। সিলেট শহরের তেলি হাওর এলাকায় এ কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে।
সিলেট মাশরুম উৎপাদন বিপণন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ডা. জালাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাংলাদেশে প্রথম মাশরুম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছি আমরা। প্রাথমিকভাবে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এর সাফল্যের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে।'
সিলেটের মাশরুম চাষী রফিকুল ইসলাম বলেন, মাশরুমের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছাড়াও বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের উৎপাদিত মাশরুম দিয়ে দেশের চাহিদা মিটছে না। ফলে বাইরে থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। আরো বেশি উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করাও সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

Tuesday, July 9, 2013

হরিন পালন নীতিমালা


প্রকৃতির এক সুন্দরতম বন্য প্রাণীর নাম হরিণ। এর রঙ-চঙা শরীর আবাল-বৃদ্ধ বনিতা সকলের নিকট আকর্ষণীয়। দেশের অধিকাংশ মানুষ যদিও হরিণ সচক্ষে দেখার সুযোগ পান না তবুও ছবির হরিণ প্রায় সকলেরই চেনা। যে শিশুটি সদ্য কথা বলতে শিখেছে সেও কিন্তু হরিণ নামের পশুটিকে শব্দে শব্দে চিনে নেয়। আর অর জ্ঞানের প্রারম্ভেই "হ"-তে হরিণ শিখে নেয় এবং রঙিন ছবির পশুটিকে তার আরো কাছে এন দেয়। হরিণ আজ আর দেশের সকল বনে-জঙ্গলে নেই। এদের আবাসমূল এখন চিড়িয়াখানায় আর সুন্দরবনে। অতি কম সংখ্যায় হলেও, তবু কিন্তু কিছু কিছু সৌখিন ব্যক্তি বাড়ির আঙ্গিঁনায় হরিণ পালন করে থাকেন।

বন্য প্রাণী বনাম গৃহপালিত পশুঃ
প্রাচীনকালে মানুষ তাদের ক্ষুধা নিবারনের জন্য বন্য পশু শিকার করত। সে সময় বন্য পশু শিকার নিতান্তই প্রয়োজনের তাগিদে ছিল, শখ বা বিনোদনের জন্য নয়। এক সাথে কয়েকটি প্রাণী ধরতে পারলে, প্রয়োজনমত জবাই করে বাকীগুলো ভবিষ্যতের জন্য গৃহে আবদ্ধ করে রাখতো। সেই ধ্যান-ধারনা থেকেই সম্ভবতঃ বন্য প্রাণী নিজ গৃহে লালন পালনের সূত্রপাত ঘটে। গৃহে আবদ্ধ বন্য প্রাণীদের মধ্যে কিছু প্রজাতি মানুষের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় এবং মানুষের কাছে থেকেই বংশবিস্তার করতে থাকে। এ প্রসংঙ্গে পবিত্র আল কুরআনের সুরা ইয়াছিনে আলাহ পাক এরশাদ করেছেন।
"আমি চতুম্পদ জন্তুগুলোকে ওদের বশীভূত করে দিয়েছি; কতক তাদের খাদ্য আর কতক তাদের বাহন, তবুও কি তারা কৃতজ্ঞ হবে না"
গরু মহিষ ভেড়া ছাগল মাংসের জন্য আর ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, হাতী বোঝা বহনের কাজে লাগানোর জন্য জঙ্গল থেকে ধরে এনে গৃহপালিত করা হয়েছে। সঙ্গত কারনেই হরিণ পালন অবাস্তব একটা ধারনা নয়।

বাংলাদেশের বন্য প্রাণী হরিণঃ
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন গাছ-পালার প্রয়োজন, তেমনি গহীন অরণ্য আর বনাঞ্চলের নীরব-শান্ত পরিবেশও বনের জীব-জন্তুদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। অরণ্যের শোভা হচ্ছে নানা জাতীয় বৃ আর উদ্ভিদ। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় বৈচিত্রময় বনে নানা ধরনের পশুপাখির সমারোহ ঘটেছে। কিন্তু দূরদর্শীতার অভাব আর খামখেয়ালী চিন্তা-ভাবনার ফলে বনরাজিকে ক্রমশঃ নিশ্চিহ্ন করে চলেছে সেরা জীব মানুষরাই। এক সময় এ দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাংগাইল, জামালপুর, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, পার্বত্য-চট্টগ্রাম ও সিলেটে ছিল মায়াভরা ডাগর চোখের মনোমোহিন দৃষ্টির হরিণদলের প্তি পদচারণা।
আগে এদেশে বেশ কয়েক প্রজাতির হরিণ ছিল। তম্মধ্যে চিত্রা, সাম্বার, পারা, বারশিংগা ও মায়া হরিণ উলেখযোগ্য। অথচ বর্তমানে কেবল চিত্রা হরিণই চোখে পড়ে, তাও কেবল সুন্দরবন অথবা চিড়িয়াখানাগুলোতে। জানা যায় সিলেটের বনাঞ্চল ও চা বাগানে আগে মায়া হরিণ বিচরণ করতো। এরা নম্র স্বভাবের আর ভয় পেলেই কুকুরের মত "ঘেউ ঘেউ" করতো। অথচ এখন আর বনের মাঝে বা চা বাগানের সঙ্কীর্ন আঁকা-বাঁকা পথে এদের দেখা যায় না। চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনেকেই সৌখিনতার বসে মায়া হরিণ পালন করতেন। হয়তো এমন হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে, বর্তমানের চিত্রা হরিণও অন্যান্য প্রজাতির হরিণের মতন এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যেহেতু চিড়িয়াখানাগুলোতে চিত্রা হরিণ অত্যন্ত সহজে পোষা সম্ভব হচ্ছে সেহেতু বসতভিটায়ও হরিণ পোষা বাস্তব দিক থেকে সম্ভব।



অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় হরিণ পালনঃ
হরিণ পালন বেশ লাভজনক। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া এবং হাঁস-মুরগির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংস অবশ্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল। সম্ভবতঃ সেটা অনেকটা দুষপ্র্যাপ্যতার কারণেই হবে। সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বসতভিটায় হরিণ পালনের মাধ্যমে আয়-রোজগার করার ধ্যান-ধারনা তাই হয়েতো অবাস্তব কিছু হবে না।
* হরিণ পালন আমাদের সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যে বাড়ীতে হরিণ পালিত হয় সে বাড়ির মালিকের পরিচিতি সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। এই পরিচিতিতে তিনি অবশ্যই আনন্দিত ও গৌরবান্বিত হন মনে মনে। সেই সাথে আগন্তুক বা জনসাধারনও বিনোদনের খোরাক পান। আর বিশেষ করে ছোট ছেলে মেয়েদেরতো সীমাহীন আনন্দের উৎস হয় এই হরিণ-হরিণী।
* পশমযুক্ত হরিণের চামড়া যা ফ্যানসি স্কিন (Fancy skin) হিসাবে ঘরের দেয়ালে শোভা বর্ধন করে তার কিন্তু মূল্য যথেষ্ট। এছাড়া চামড়াজাত বিভিন্ন প্রকারের অতি মূল্যবান পণ্য তৈরিতে হরিণের চামড়া ব্যবহৃত হয়। দেশে বিদেশে ঘরের পরিবেশ সুশোভিত করতে হরিণের ফ্যানসি চামড়া অতি কাঙ্খিত একটি উপকরণ।
* হরিণের শিং যে কতো বৈচিত্রময় ও কাব্যিক হতে পারে তার একমাত্র দৃষ্টান্ত হচ্ছে সে নিজেই। পুরুষ হরিণের এক জোড়া শিং ড্রয়িং রুমের অবরবকে আভিজাত্য আর সৌন্দর্যের আবরণে রূপময় করে তোলে। উলেখ্য যে প্রজনন ঋতুতে হরিণের মাথায় শিং গজায় এবং এক সময় তা আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে খসে পড়ে। ফলে সখের বশে হরিণ পালন করা হলে তা থেকে প্রতি বছরই এক জোড়া শিং উপহার পাওয়া যায়।

বসতবাড়ীতে হরিণ পালন ও পরিচর্যাঃ
কৃষিভিত্তিক এদশের মানুষ বহুকাল ধরেই গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল পালন করে আসছে। তাদের এ বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তৃনভোজী আলোচ্য এই আকার্ষণীয় প্রাণীটিকে লালন পালন ও পরিচর্যার জন্য উদুদ্ধকরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ছাগল পালনের ন্যায় হরিণ পালনও একটি সহজসাধ্য ব্যাপার। আমাদের দেশের আবহাওয়া হরিণ পালনের জন্য যথেষ্ট অনুকূল। পরিচর্যার ক্ষেত্রে তেমন কোনো জটিলতা না থাকলেও এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পশুচিকিৎসক ও পশুপুষ্টিবিদগণ সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করতে পারবেন। বর্তমান বিশ্ব এখন প্রযুক্তির চরম সীমায় উপস্থিতি। এমতবস্থায় হরিণ পালনকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের কাঠামোতে অন্তভূক্ত করা যায় কীনা সেটা সম্ভবতঃ ভাববার সময় এসেছে। সরকার ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করলে হয়তো একটা দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

হরিণ সংরক্ষণে প্রয়োজন গণ সচেতনতাঃ
বন্য প্রাণী হরিণ আমাদের জাতীয় সম্পদ। বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হয়ে এ প্রাণীর জীবন বিপন্ন হতে চলেছে। অর্থলোভী হিংস্র শিকারীদের দুর্বার আকর্ষন এখন অসহায় মায়াবী হরিণ কুলের উপর। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকহারে হরিণ শিকারের সংবাদ প্রায়শঃ দেখা যাচ্ছে যা আমাদের দেশের জন্য সত্যিই অত্যন্ত হতাশা ও উদ্বেনের বিষয়। পত্রিকান্তরে জানা যায় "শীতের শুরুতেই সংঘবদ্ধ শিকারীদের তৎপরতা শুরু হয়। অহরহ উদ্ধার করা হয় জীবিত অথবা মৃত হরিণ ও হরিণের চামড়া। সমপ্রতি হরিণ শিকারের ১ হাজার ফাঁদসহ একটি ট্রলার আটক করা হয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের শরনখোলা রেঞ্জের দুবলারচরে প্রতিবছর হিন্দু সমপ্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব রাসমেলা উদযাপিত হয়ে থাকে। এই মেলাকে উপল্য করে এক শ্রেণীর দুবৃত্ত যারা শিকারী নামে অভিহিত মেতে ওঠে হরিণ শিকার যজ্ঞেও। শিকারীদের ফাঁদে আটকে পড়া হরিণের পায়ের গোড়ালীতে মারাত্মক ক্ষত হয়। মাঝে মধ্যে এসব দুষকৃতকারীদের কেউ কেউ ধরা পাড়লেও অধিকাংশই রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সুন্দরবনে অন্যায়ভাবে প্রতিদিন কত হরিণ শিকার হচ্ছে তার কোনো খতিয়ান পাওয়া যায় না। প্রাকৃতিক গুরুত্বের কারণে সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষনা করা হয়েছে। একটি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই, অবিলম্বে সুন্দরবনের হরিণ রক্ষার পাশাপাশি দেশের চিড়িয়াখানাগুলোতে ব্যাপকভাবে হরিণের প্রজনন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের হরিণ প্রজনন কেন্দ্রের আদলে আভয়ারণ্যগুলোতে হরিণের প্রাকৃতিক বিচরণ ভূমি সৃষ্টি করতে হবে। উৎসাহী ও অভিজ্ঞ চাষীদের মাঝে হরিণ শাবক বিলির ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। হয়তবা সেদিন আর বেশি দূরে নয় যখন কৃষকের বসতভিটা হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলের পাশে মায়াবী হরিণ-হরিণী কৃষক কূলের মনকে কাব্যিক করে তুলবে।

হরিন পালনের নীতিমালা

বনের চিত্রল হরিণ এখন থেকে ঘরে ও খামারে পোষা যাবে। তবে এ জন্য পালনকারীকে হরিণের বসবাস উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ জন্য একটি নীতিমালা অনুমোদন করেছে। এতে বন বিভাগকে হরিণ পোষার অনুমতির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বন বিভাগ দেশের বিভিন্ন বন অফিস থেকে হরিণ পোষার অনুমোদন দিতেও শুরু করেছে।

পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, ঢালাওভাবে হরিণ পালনের অনুমতি দিলে এর অপব্যবহার হতে পারে। বন্য হরিণ আরও বিপন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী আইন (সংরক্ষণ, সংশোধন), ১৯৭৪-এর আওতায় চিত্রল হরিণ পোষাসংক্রান্ত নীতিমালা-২০০৯ অনুমোদন করেছে সরকার। তবে চিত্রল ছাড়া অন্য কোনো হরিণ পোষা যাবে না। কেউ অন্য হরিণ পুষলে তাঁর বিরুদ্ধে বন্য প্রাণী আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগে বন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হরিণ লালন-পালনের অনুমোদন দিত। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কাছ থেকে প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হতো। এই নতুন নীতিমালায় চিত্রল হরিণ লালন-পালন ও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।

নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, চিত্রল হরিণ পাওয়া যায় এমন বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে এই হরিণ পোষা যাবে না। ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০টি চিত্রল হরিণ পোষা যাবে। এর বেশি হলে খামার হিসেবে অনুমতি নিতে হবে। বন বিভাগ ও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী হরিণ বিক্রি করতে পারবে। তবে হরিণ কিনতে হলে বন বিভাগের কাছ থেকে ‘পজেশন সার্টিফিকেট’ নিতে হবে।
পরিবেশ ও বনসচিব মিহির কান্তি মজুমদার এ ব্যাপারে বলেন, ‘হরিণ পালনের জন্য নীতিমালা অনুমোদিত হলেও বন বিভাগ আপাতত কোনো হরিণ বিক্রি করবে না। দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যে হরিণগুলো রয়েছে, ওই হরিণগুলোকে ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতা দেওয়া হবে।’
খামার ছাড়া অন্যত্র অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে বা বাসাবাড়িতে চিত্রল হরিণ পোষার অনুমোদন ফি ধার্য করা হয়েছে ৫০০ টাকা। মহানগর এলাকায় প্রতি খামারের জন্য অনুমোদন ফি দুই হাজার টাকা। জেলা সদর এলাকায় প্রতি খামারের জন্য ফি আড়াই হাজার টাকা। অন্য এলাকায় খামারের জন্য ফি দুই হাজার টাকা। প্রতিটি হরিণের জন্য পজেশন ফি ১০০ ও নবায়ন ফি বছরে ১০০ টাকা।

খামারের হরিণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষক ও ব্যক্তিগত হরিণের ক্ষেত্রে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন দিতে হবে। হরিণ পরিণত হলে তার মাংস খাওয়া যাবে। তবে বাচ্চা প্রসব করলে বা মারা গেলে ঘটনা ঘটার ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কাছে তা জানাতে হবে। হরিণের মাংস বা কোনো অঙ্গ স্থানান্তর করতে হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে স্থানান্তর অনুমোদন নিতে হবে। কাউকে হরিণ দান করতে হলেও বন বিভাগকে অবহিত করতে হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ চিত্রল হরিণ রয়েছে। চিত্রল হরিণের মূল বসতি এলাকা সুন্দরবনে রয়েছে প্রায় দেড় লাখ। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার। এ ছাড়া চর কুকরিমুকরি, বাঁশখালীসহ উপকূলীয় বনে বিচ্ছিন্নভাবে হরিণের বসতি রয়েছে। 


লেখক: মোঃ আনোয়ারুল কাদির

মাটির তৈরি টালি ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে

ইতালিতে মাটির টালি রপ্তানির চেষ্টা করেন রুহুল আমিন। সে জন্য তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উপযুক্ত মাটি খুঁজতে থাকেন। অবশেষে তিনি সেই কাঙ্ক্ষিত মাটির সন্ধান পান কলারোয়ার মুরারিকাটি-শ্রীপতিপুর এলাকায়। আর এতেই বদলে যায় কলারোয়ার মৃৎশিল্পীদের ভাগ্য। তাঁরা এখন আর হাঁড়ি-কলসী তৈরি করেন না। মাটির কারিগররা তৈরি করছেন বাহারি টালি। টালি রপ্তানি হচ্ছে ইতালি, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।
কলারোয়া থেকে ২০০৩ সালে ইতালিতে টালি রফতানি করেন কাররা এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্ত্বাধিকারী রুহুল আমিন। তিনিই প্রথম এ এলাকায় টালি রপ্তানির পথ দেখান। আর এ পথ ধরেই গত সাত বছরে এ এলাকায় স্থাপিত হয়েছে ২৫-৩০টির মতো টালি কারখানা। ইউরোপের দেশগুলোয় মাটির তৈরি টালির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। দীর্ঘ এ সময়ে সাতক্ষীরার তৈরি প্রচুর টালি মংলা বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়েছে।  সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়ার মৃৎশিল্পীরা এখন আর হাঁড়ি-কলসী তৈরি করেন না। তবুও তাঁদের ঘরে নেই অভাব-অনটন। মুরারিকাটি-শ্রীপতিপুরের মাটির কারিগররা এখন তৈরি করেন বাহারি টালি। তাদের মেধা ও শ্রমে তৈরি করা টালি আজ ঠাঁই করে নিয়েছে দেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকায়। ইউরোপের কয়েকটি দেশে এখন রপ্তানি করা হচ্ছে এসব টালি। বাংলাদেশের কাদা মাটির তৈরি টালি শীতপ্রধান দেশে ভবনগুলোকে বরফ থেকে রক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া শোভাবর্ধনের কাজেও ব্যবহার হচ্ছে টালি। মুরারিকাটি-শ্রীপতিপুর পরিচিতি পেয়েছে 'ইতালি নগর' নামে।
 সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রত্যেকটি কারখানায় রপ্তানির জন্য মজুদ করা আছে বিপুল পরিমাণ বাহারি ডিজাইনের টালি। শত শত নরী-পুরুষ মাটি দিয়ে তৈরি করছেন টালি। প্রতি কারখানাতে ২৫-৩০ জন করে কারিগর ও শ্রমিক কাজ করেন। এসব মাটির কারিগররা কাজের দক্ষতার ভিত্তিতে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা দৈনিক পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এ টাকায় তাঁরা সংসারের প্রয়োজন মিটিয়েও কিছুটা সঞ্চয় করতে পারেন।  জানা যায়, শীতই টালি তৈরির মৌসুম। কলারোয়া ক্লে টাইলস, আরনো এক্সপোর্ট- ইমপোর্ট, জেএস ট্রেডার্স, ডি চন্দ্র পাল, নিকিতা ইন্টারন্যাশনাল ও কটো ইনোভেটর লিমিটেড গত কয়েক বছর ধরে টালি রপ্তানি করে আসছে। রেক্ট্যাঙ্গুলার, স্কয়ার, অ্যাঙ্গুলার, ব্রিকস শেপড_এসব বিভিন্ন আকার ও ডিজাইনের টালি তৈরি ও রপ্তানি করা হয়। ক্লে টাইলসের স্বত্বাধিকারী গোষ্ঠ চন্দ্র গোপাল বলেন, 'ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দিন-দিন আমাদের তৈরি করা টালির চাহিদা বাড়ছে। তবে টালি কারখানার সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্টক থেকে যাচ্ছে। প্রতিবছর মংলা বন্দর দিয়ে কনটেইনারে ভর্তি করে ৭ থেকে ১০ মেট্রিকটন টালি ইটালি, জার্মানি ও বেলজিয়ামে রপ্তানি হচ্ছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী ট্রাফিক ম্যানেজার শেখ আবদুস সালাম জানান, গত ৭ বছরে মংলা বন্দর দিয়ে সাতক্ষীরার তৈরি কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন টালি বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। সরকার এ খাতকে উৎসাহী করতে রপ্তানি পণ্যের অর্থের ওপর শতকরা আড়াই পারসেন্ট রেয়াতি সুবিধা দিচ্ছে। এখান থেকে প্রতি বছর ৩০০-৪০০ কনটেইনার টালি ইতালি জার্মানি ও বেলজিয়াম যায়।
এম জিললুর রহমান, সাতক্ষীরা-সাতক্ষীরায় মাটির তৈরি টালি শুধু বিদেশীদের নজর কাড়েনি, ঘুরিয়েছে দেশের অর্থনীতির চাকাও।কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি, শ্রীপতিপুর ও মির্জাপুর এ তিন গ্রাম এখন টালি শিল্প পল্লী হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। তিনটি গ্রামে টালি কারখানা রয়েছে প্রায় ৩২টি। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত এ টালি দেশের মানুষ ঘরের চালের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। ২০০০ সালের পর থেকে মাটির তৈরি টালি বিদেশে রফতানি হতে থাকে। প্রথমে টালি ইতালির বাজার দখল করে। পরে তা বিস্তৃত হয়ে নেদারল্যান্ড, দুবাই, স্পেন, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে ক্রেতা সৃষ্টি করেছে।  বছরে বিদেশে টালি রফতানি করে কলারোয়া টালি শিল্প পল্লীর কারখানা মালিকরা আয় করেছেন প্রায় ১২ কোটি টাকা।
 গোস্ট চন্দ্র পাল বলেন,  বছরে ৬ থেকে ৭ মাস টালি তৈরি ও বিক্রয় হয়। সাধারণত বছরের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হয় টালি তৈরি মৌসুম। চলে মে/জুন পর্যন্ত। বাকি সময় বর্ষাকাল থাকায় টালি তৈরি করা যায় না। ১৫ থেকে ২০ প্রকার টালি রয়েছে তার কারখানায়। একেকটি টালির একেক রকম নাম। তাদের মধ্যে স্কয়ার, রকট্যাংগুলার, স্টেপ টাইলস, হেক্সা গোনার, স্কাটিং প্রভেন, সালেহ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। প্রতি পিস টালির দাম ২ টাকা থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত। ৩০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ২০ সেন্টিমিটার প্রস্থ ও ৩ সেন্টিমিটার পুরু একটি স্কায়ার টালির দাম ১০ টাকা। ৫০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ২৫ সেন্টিমিটার প্রস্থ ও ৩ সে.মি. পুরু রেকট্যাংগুলোর টালির দাম ৩২ টাকা, বহুল প্রচলিত ৩০ সে.মি দৈর্ঘ্য ১৫ সে.মি প্রস্থ ও আড়াই সে.মি পুরু একটি রেকট্যাংগুলার টালির দাম ৬ টাকা। আবার ৪০ সে.মি প্রস্থ ও ৩ সে.মি পুরু একটি স্কয়ার টালির দাম ৪০ টাকা। স্কয়ার টালি সাধারণত দেয়ালের শোভাবর্ধনে ঘরের চালের ছাউনিতে ব্যবহার করে থাকে বিদেশীরা।
 ঘরের মেঝে সাজানোর জন্য রয়েছে ফুলের আকারে প্রভেন সালেহ। প্রতি পিস প্রভেনসালের দাম ২৫ টাকা। এভাবে একেকটি টালির নকশা, গঠন ও আকার অনুযায়ী দামের তফাৎ রয়েছে। দাম সস্তা হলেও এগুলোর সৌন্দর্য, গুণগতমান ও স্থায়িত্ব অতুলনীয়। ঘর সাজানোর জন্য শিল্পীরা তৈরি করেছেন সার্কেল টাইলস। ৪টি সার্কেল টাইলস নিয়ে একটি সেট। এক সেট সার্কেল টাইলস’র দাম ৪০ টাকা। গোস্ট চন্দ্র পাল আরো বলেন, সাতক্ষীরার মাটির তৈরি এসব টালি মংলা বন্দর দিয়ে দুবাই ও ইউরোপে রফতানি করা হয়। দুবাই থেকে আবার কিছু টালি প্রসেসিং হয়ে আমেরিকারসহ বিভিন্ন দেশে যায়। বর্তমানে ফ্রান্সের বাজার ধরার চেষ্ট চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো মেশিন বা যন্ত্র ছাড়াই কারিগররা তাদের সুনিপুণ হাতের স্পর্শে মাটি দিয়ে তৈরি করেন এসব টালি। তৈরিকৃত টালি রোদে শুকানোর পর চুল্লিতে বা পনে পোড়ানো হয়। ১৬ ঘণ্টা বিশেষ নিয়মে পনে জ্বাল দিতে হয়। জ্বাল দেয়ায় হেরফের হলে টালির আকার আকৃতি ও পোড়ের কম বেশি হয়। এতে টালির মান ভালো হয় না। সাধারণত মাসে একবার একটি পনে টালি পোড়ানো হয়।  তিনি বলেন, সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্টপোষকতা পেলে এ শিল্প থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা আয় করে দেশের অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে পারবে। দারিদ্য বিমোচনে এ শিল্প উন্মোচন করতে পারে সম্ভাবনার নব দিগন্ত।  টালি শিল্পের বিকাশে কিছু প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এলাকার কারখানা মালিকরা ঐক্যবদ্ধ নয়। ফলে একেক মূল্য। মহাজনরা বাকিতে টালি কিনে সময়মতো বিল শোধ করে না। একই গ্রামের সন্তোষ পালের স্ত্রী অলোকা পাল আক্ষেপ করে বলেন, এই শিল্পে আমাদের রুটি রুজির উৎস। এর উপরেই বেঁচে আছি আমরা। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে গত বছর টালি তৈরি করে মহাজনদের হাতে তুলে দিয়েছি এখনো টাকা দেয়নি।

Sunday, June 16, 2013

বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক আঙুর চাষ


 জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারের বাসিন্দা রুহুল ইসলাম  ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলের প্রধান প্রকৌশলী। ৪ বছর আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া প্রদেশের মিলডোয়ায় এক আঙুর খামার মালিকের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। জয়পুরহাট জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে অস্ট্রেলিয়ার সেই খামারির পরামর্শে ২০০৯ সালে বীজহীন দুই জাতের এক হাজার আঙুরের চারা অস্ট্রেলিয়া থেকে আনান। এই চারার মধ্যে মেনিনডি ও ক্রিমসন সিডলেস জাত রয়েছে। তিনি তার ৬ বিঘা জমির উপরি ভাগের মাটি কেটে তুলে ফেলে ২ ফুট বালু ও মুরগির বিষ্ঠা মিশিয়ে আঙুর চাষের উপযোগী করে জমি তৈরি করেন। বিদেশ থেকে আনা ওই চারাগুলো থেকে তিনি আরও ২২৫টি চারা তৈরি করে মোট এক হাজার দুইশ' চারা তার জমিতে লাগান। আরসিসি খুঁটি ও জিআই তার দিয়ে তৈরি করেন জাংলা। অস্ট্রেলিয়ার ওই খামারির পরামর্শে তিনি তার আঙুরের বাগান পরিচর্যা করতে থাকেন। বাগান পরিচর্যার জন্য সার্বক্ষণিক ৬ জন কাজ করছে। রোগবালাই তেমন না থাকলেও পাখির হাত থেকে রক্ষার জন্য পলিথিনের ব্যাগ দিয়ে আঙুরের থোকা ঢেকে দিতে হয়। ১ বছর ৮ মাস পর রুহুল ইসলামের এই বিশাল বাগানের ৫শ' গাছে এখন থোকা থোকা মিষ্টি আঙুর ঝুলছে। ইতিমধ্যে ওই বাগান থেকে আঙুর বিক্রিও শুরু হয়েছে। প্রতি থোকায় ১৫-৩৫টি আঙুর ধরেছে, যার ওজন ১০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। ইতিমধ্যে প্রতি কেজি আঙুর ২৬০ টাকা দরে বিক্রি করে বাণিজ্যিকভাবে আঙুরের বিক্রি শুরু করেছেন রুহুল ইসলাম। বাগানে লাগানো আঙুর গাছগুলোতে বছরে দু'বার আঙুর ধরবে। এই আঙুর বিদেশি আঙুরের মতোই মিষ্টি ও সুস্বাদু। জমি বাদে তাদের এই বাগান তৈরি করতে এ পর্যন্ত ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তারা এই গাছ থেকে ১০ হাজার চারা তৈরি করেছেন। এ বছর আঙুর ও চারা বিক্রি করে এক কোটি টাকা আয় করবেন বলে প্রকৌশলী রুহুল ইসলামের ভাই বাগান তত্ত্বাবধায়ক জিল্লুর রহমান আশা করছেন। জয়পুরহাট জেলা কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোঃ আবুল কালাম আজাদ জানান, আমরা প্রায়ই রুহুল ইসলামের আঙুরের বাগানে যাই এবং তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। আঙুরগুলো খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদুু। জয়পুরহাটের মাটিতে আঙুর চাষ লাভজনক হবে। জয়পুরহাটে রুহুল ইসলামের আঙুর চাষের পর এই লাভজনক আবাদের বিষয়ে আরও অনেকে উৎসাহিত হয়ে উঠছেন। এই লাভজনক আবাদ সম্প্রসারিত হলে অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চলে একটি বিপল্গব ঘটবে। আঙুর চাষের এলাকা সম্প্রসারিত হলে একদিকে দেশের আঙুরের চাহিদা অনেকটা মিটবে এবং অন্যদিকে বিদেশ থেকে আঙুর আনার প্রবণতা কমে যাবে। বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্রা। আঙুর আসবে সাধারণ মানুষের নাগালে।

Saturday, June 15, 2013

কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল


বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম অনুসারে হালকা কৃষি যন্ত্রাংশ ও কৃষি পণ্যের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানই এসএমই খাতভুক্ত। শিল্পের ভূমি ও ইমারত খরচ বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পর্যন্ত এসএমই শিল্প খাতের আওতায়। দেশের বিভাগীয় সদর ও নারায়ণগঞ্জ শহর বাদে কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য মফস্বলভিত্তিক শিল্প স্থাপনের জন্য এই ঋণ দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকা অনুযায়ী ৩৬টি খাতের মধ্যে ২০টি খাদ্যজাত ও ১৬টি খাদ্য বহির্ভূত কৃষিজাত শিল্প হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৬২ কোটি ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৭ টাকা। এ বিতরণকৃত ঋণ ২১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ১৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৯৯৩টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে।

জানা গেছে, কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতের সুষ্ঠু বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক শতভাগ পুনঃঅর্থায়ন করে থাকে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন অনুসারে ঋণ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কৃষিভিত্তিক এ শিল্প খাতে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ সুদে চলতি মূলধন এক বছর , তিন বছর , পাঁচ বছর মেয়াদ হারে এ ঋণ দিয়ে থাকে।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

Friday, June 14, 2013

গ্যানোডার্মার বীজ উত্পাদন


গ্যানোডার্মার বীজ উত্পাদন:
মাশরুমের অঙ্গজ বীজ অর্থাত্ স্পন তৈরির জন্য প্রধান উপাদান হিসেবে কাঠের গুঁড়ো,আখের ছোবরা,ভুট্টার খড় ব্যবহার করা যায়, এর সাথে সাপ্লিমেন্ট হিসেবে গমের ভূষি, চালের কুঁড়া, ভুট্টার গুঁড়ো প্রভৃতিব্যবহার করাযায়।মাশরুম উন্নয়নওকেন্দ্র কাঠের গুঁড়ো, গমের ভূষি ও চালের কুঁড়া দিয়ে অত্যন্ত সহজে স্পন তৈরি করছে যাতে ভাল ফলনপাওয়াযায়।
সাবস্ট্রেট ফরমুলেশন ও স্পন তৈরি:
ফরমুলেশন-১: কাঠের গুঁড়ো- ৭০%, গমের ভূষি-২৫%, ধানের তুষ-০৫%, ক্যালসিয়াম কার্বনেট-০.২%, পানি- ৫০ থেকে ৬০%।
ফরমুলেশন-২: কাঠের গুঁড়ো- ৭০%, চালের কুঁড়া ২২.৫%, ধানের তুষ-২.৫%, ক্যালসিয়াম কার্বনেট-০.২%,  পানি- ৫০ থেকে ৬০%।
 উল্লেখিত উপাদানগুলো ভালভাবে মিশিয়ে পিপি ব্যাগে ১ কেজি অথবা আধা কেজিকরে ভরে প্লাস্টিক নেক দিয়ে বেঁধে কাঠের কীলক দ্বারা প্যাকেটের মুখে গর্ত করে দিতে হবে। এরপর কটনপ্লাগ দিয়ে মুখ বন্ধ করে ব্রাউন পেপার এবং রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এরপর অটোক্লেভ মেশিনে ১২০০ সে. তাপমাত্রায় ১.৫কেজি/ঘন ইঞ্চি বাষ্প চাপে ২ ঘণ্টা রেখে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। প্যাকেট ঠাণ্ডা হলে ল্যাবরেটরিতে ক্লিনবেঞ্চে জীবাণুমুক্ত অবস্থায় মাদার কালচার দিয়ে উক্ত প্যাকেটে ইনোকুলেশন করতে হবে। ইনোকুলেশনকৃত প্যাকেটগুলোকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন অন্ধকার ঘরে ২৮ থেকে ৩৫০ সে. তাপমাত্রায় মাইসেলিয়াল কলোনাইজেশনের জন্য রেখে দিতে হবে। এভাবে ২০থেকে ২৫ দিন রাখার পর মাইসেলিয়াম দ্বারা প্যাকেট পূর্ণ হবে যা পরবর্তীতে চাষ ঘরে ব্যবহূত হবে।
প্যাকেট কাটা:  গ্যানোডার্মা মাশরুমের স্পন প্যাকেট বিভিন্নভাবে কাটা যায়। চাষ ঘরে প্যাকেট বসানোর আগে মাইসেলিয়াম পূর্ণ স্পন প্যাকেট হতে নেক, তুলা, ব্রাউন পেপার ইত্যাদি খুলে প্যাকেটের মুখ রাবার ব্যান্ড দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। কোণাযুক্ত প্যাকেটের একপাশে মাঝ বরাবর এক বর্গ সে.মি. আকারে পিপি কেটে ব্লেড দিয়ে সাদা অংশ চেঁছে ফেলতে হবে। এরপর চাষ ঘরের তাকে সারি সারি করে বসিয়ে দিতে হবে। স্পন প্যাকেট হতে নেক, তুলা, ব্রাউন পেপার ইত্যাদি খুলে প্যাকেটের মুখ খোলা রেখে দিয়েও মাশরুম চাষ করা যায়। চাষ ঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের কৌশল থাকলে স্পন প্যাকেটের উপরের পুরো মুখ খুলে দিয়ে ও মাশরুম চাষ করা যেতে পারে।
পরিচর্যা: প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য দিনে ৩ থেকে ৪ বার মৃদু পানি সেপ্র করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন কোনো অবস্থায় আর্দ্রতার পরিমাণ কমে না যায়। এভাবে পরিচর্যা করলে ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই সাদা শক্ত মাসরুমের কুড়ি , ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে আঙুলেরমত লম্বা হয়ে লালচে বর্ণের এবং ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রভাগ হাতের তালুরমত চ্যাপ্টাকৃতি ধারণ করবে। এই অবস্থায় চাষ ঘরের আলো ও বায়ু চলাচল বাড়িয়ে দিতে হবে।
মাশরুম সংগ্রহ: ঘরে বসানোর দের মাসের মধ্যেই মাশরুম সংগ্রহ করা যায়। পরিপক্ক ফ্রুটিং বডি সংগ্রহের উপযোগী লক্ষণ হল মাসরুমের কিনারার বৃদ্ধি থেমে গিয়ে চকচকে লাল বর্ণ ধারণ করে এবং অসংখ্য লালচে স্পোর নিচে পরতে দেখা যায়। পরিপক্ক ফ্রুটিং বডি তুলে নেওয়ার পরে প্যাকেটের কাটা স্থানে একটু চেঁছে দিলে খুব দ্রুত দ্বিতীয় বার ফলন পাওয়া যায়। এভাবে নিয়মিত পরিচর্যা করলে প্রতি প্যাকেট হতে ৩ থেকে ৪ বার ফলন পাওয়া সম্ভব। প্রতি কেজি স্পন থেকে ৭০ থেকে ৯০ গ্রাম মাশরুম পাওয়া যায়।
সংরক্ষণ:
গ্যানোডার্মা মাশরুম সংগ্রহ করে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রোদে শুকাতে হবে। এরপর পিপি ব্যাগে বা বোতলে ভরে বায়ুরোধী অবস্থায় ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়া স্লাইস বা পাউডার করেও অনেক দিন রাখা যায়। ৩.০-৩.৫ কেজি তাজা মাশরুম শুকালে ১ কেজি শুকনো ঋষি মাশরুম পাওয়া যায়।
ব্যবহার: মাশরুম পাউডার করে বা স্লাাইস করে কেটে পানিতে মৃদু তাপে জ্বাল দিয়ে মাশরুমের নির্জাস বের করে লেবুর রসসহ গরম-গরম অথবা ঠাণ্ডা করে খাওয়া যায়।