আফ্রিকার চার দেশে বাংলাদেশের বড় ধরনের রপ্তানি 08 Mar, 2013
আফ্রিকার চার দেশ মরক্কো, নাইজেরিয়া, সেনেগাল ও সিয়েরালিওনে বাংলাদেশের বড় ধরনের রপ্তানি সম্ভাবনার তথ্য তুলে ধরে দেশ চারটির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের অনুরোধ করেছে মরক্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাস। মরক্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মো. লুৎফর রহমান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, এ চার দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করা হলে বাংলাদেশের রপ্তানি অনেক বাড়বে।
এ চার দেশ ছাড়াও নিজেদের মধ্যে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য আজারবাইজানের সঙ্গে চুক্তি করবে বাংলাদেশ। 'দ্বিপাক্ষীয় পুঁজি বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ' শীর্ষক ওই চুক্তি অনুযায়ী, একটি দেশ অন্য দেশটিতে পুঁজি বিনিয়োগ করলে ওই দেশের বিনিয়োগকারীদের মতোই সুযোগ সুবিধা পাবে। এমন শর্ত রেখে চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের মধ্যবর্তী একটি দেশ আজারবাইজান মূলত তেলনির্ভর অর্থনীতি। দেশটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় প্রণীত খসড়ায় বলা হয়েছে, দুই দেশ নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিজেদের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তেমনি ওই বিনিয়োগগুলো সংরক্ষণও করা প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ প্রয়োজন। তেমনি সরকারেরও উদ্যোগ প্রয়োজন। খসড়ায় বলা হয়েছে, দুই দেশ নিজেদের মধ্যে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে। চুক্তি করা দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মতোই সুযোগ-সুবিধা দেবে। যুদ্ধ, সংঘাত ইত্যাদির কারণে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মতো সমান আচরণ করা হবে। দেশ দুটি নিজ দেশে অন্য দেশটির বিনিয়োগকে উচ্ছেদ বা জাতীয়করণ বা অন্য কোনো ধরনের কাজ করবে না যাতে জাতীয়করণের প্রভাব পড়ে। বিনিয়োগ দেশে ফিরিয়ে আনা বা মুনাফা ফিরিয়ে আনতে সুরক্ষা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে চুক্তির খসড়ায়।
বাংলাদেশের সঙ্গে আজারবাইজানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই বললেই চলে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের গবেষণা সেল জানায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ আজারবাইজান থেকে কোন পণ্য আমদানি করেনি। তবে ৩২ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৩১ হাজার ডলারের পাটজাত পণ্য। বাকি পণ্য নারী-পুরুষের অন্তর্বাস।
বাংলাদেশে অনেক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এখানে বেশ কিছু খাত বিকাশ লাভ করেছে।
দেশটির আয়তন ৮৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৯৬ লাখের কাছাকাছি। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ৯৩ বিলিয়ন ডলার (২০১১)। ওই দেশের ১১ শতাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। আজারবাইজানের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেলের ভাণ্ডার।
অর্থনীতির আকার ও আরো কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে আজারবাইজান। ইনডেক্সমুঁডির তথ্য মতে, ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৯৩ বিলিয়ন ডলার (২০১১)। সেখানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২৮২ বিলিয়ন ডলার। দেশটির দেশজ উৎপাদনের ১৭ শতাংশ বিনিয়োগ হয়। বাংলাদেশের হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি চার শতাংশ। আজারবাইজানের প্রায় ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, মরক্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এর দেওয়া তথ্য মতে, এক হাজার ডলার মাথাপিছু আয়ের মরক্কো প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফেব্রিক, তৈরি পোশাক, ওষুধ, মোটরসাইকেল, আইটি পণ্য, বৈদ্যুতিক তার, ব্যাটারি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চা, আম, আনারস ও নারিকেল আমদানি করে থাকে। দেশটিতে বাংলাদেশি পাট, ফেব্রিক্স, ওষুধ, তৈরি পোশাক, খাদ্য-পানীয় রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল মরক্কোয় রপ্তানির সম্ভাবনা দেখতে দেশটি ঘুরে এসেছেন। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক ও মিসরের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। ফলে এসব দেশের পণ্যই বেশি আমদানি হয়। বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের রপ্তানিকারকদের মরক্কোয় পণ্য রপ্তানি করতে গেলে ৭৯ শতাংশ শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। আর যেসব দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে সেসব দেশের ক্ষেত্রে শুল্ককর দিতে হয় মাত্র ২০ শতাংশ। অসম প্রতিযোগিতার কারণে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশি তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে এইচঅ্যান্ডএম, গ্যাপ ও নেক্সট ইত্যাদি কম্পানির মাধ্যমে মরক্কোতে রপ্তানি হচ্ছে। উচ্চ শুল্কহারের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশটির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি অনেক বাড়বে।
নাইজেরিয়া সরকার সম্প্রতি তৈরি পোশাক আমদানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় তা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ বলে উল্লেখ করেছেন লুৎফর রহমান। তিনি বলেছেন, তৈরি পোশাক ছাড়াও নাইজেরিয়া ওষুধ, পাট, সিরামিক, স্যানেটারি ওয়্যার, চামড়া, প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য, তামাক ও জুতা রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সাড়ে ১৫ কোটি জনসংখ্যার এ দেশের মাথাপিছু আয় ২৬০০ ডলার। ফলে নাইজেরিয়ার বাজার বিশাল। অন্যদিকে সেনেগালেও বাংলাদেশ থেকে ওষুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, চামড়া, রাবার, ইলেকট্রিক্যাল ও হাল্কা প্রকৌশল সামগ্রী ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে
No comments:
Post a Comment